এক বখতিয়ার লোকান্তরে হাজার বখতিয়ার ঘরে ঘরে!

১৬

স্টাফ রিপোর্টার, রোহিঙ্গা টিভি: 

বিশ্বের মেগা শরণার্থী ক্যাম্প হিসেবে পরিচিত কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির ও তদসংলগ্ন বাজার নিয়ন্ত্রনে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিল বখতিয়ার মৌলভী। তিনি ছিলেন উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নং ওয়র্ডের মেম্বার। মানুষের মুখে মুখে শুনা যেতো বখতিয়ারের শক্তি, অপশক্তি ও অর্থ প্রতিপত্তির নানা কিচ্ছা কাহিনী। লোকমুখে তাঁর উপাধী ছিল রাজা। প্রায় ৩ দশকের বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত কুতুপালংয়ে তিনি অঘোষিত রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। গত ২৪ জুলাই বাংলাদেশ পুলিশের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তিনি মারা যান। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, তিনি মাদক চোরাচালান পথেরও রাজা ছিলেন। এক বখতিয়ার জীবনাবসানে তিনি লোকান্তর হলেও, রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে হাজারও বখতিয়ার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আশংকা রয়েছে।

বখতিয়ার মৌলভী

বখতিয়ারের উত্থান

৯০ দশকের শুরুর দিকে  টং দোকানের সামান্য চা বিক্রেতা ছিলেন বখতিয়ার। ১৯৯২ সালে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্যে তৎকালীন জান্তা সরকার বর্বরতা শুরু করলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের কুতুপালং, জাদী মোড়া, ধেচুয়াপালং ও মুছনীতে আশ্রয় নেয়। এ সুযোগকে কাজে লাগায় বখতিয়ার মৌলভী। নতুন আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রন শুরু করে। তৈরী করে বিশাল বাহিনী ও নেটওয়ার্ক। রোহিঙ্গাদের পুঁজি করে দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, জায়গা-জমি ভাড়া ও ঘরবাড়ি ভাড়া দিয়ে রাতারাতি হয়ে ওঠে কোটি টাকার মালিক।

টাকার নেশায় বৈধ ব্যবসার সাথে অবৈধ ব্যবসার সমন্বয় করে ত্রিশ বছরে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হন বখতিয়ার। কালো টাকাকে সাদা করতে টাকা ছড়িয়ে ইউপি মেম্বার বনে যান তিনি। রোহিঙ্গাদের বিচার শালিশ, এনজিও নিয়ন্ত্রণ, চাকরি দেয়ার নামে অর্থ আদায়, রোহিঙ্গাদের নামে আসা বৈদেশিক সাহায্যের ভাগ নেয়া, ইয়াবা সিন্ডিকেট পরিচালনা, রোহিঙ্গা শেডের ভাড়ার নামে চাঁদাবাজিসহ নানা কর্মকান্ডে আলোচনা-সমালোচনার তুঙ্গে ছিলেন তিনি। তবে তার বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলে কথা বলার মতো সাহস কারো ছিলনা। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে  প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিক ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের টপ টু বটম অফিসারদের টাকার বিনিময়ে ম্যানেজ করে নিতেন তিনি।

বখতিয়ার মেম্বারের হুকুমে চলতো পুরো কুতুপালং। স্থানীয় বা রোহিঙ্গা কেউ তাঁর হুকুমের বাহিরে যেতোনা। কেউ তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করলে হয় মৃত্যু নয় পঙ্গুত্ব বরণ করতে হতো। ফলে অন্যকোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠি বখতিয়ারের রাজ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।

কুতুপালং মেগা রোহিঙ্গা ক্যাম্প

নতুন অপশক্তির উত্থানের আশংকা

বখতিয়ার মৌলভীর ভয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও আশে-পাশের এলাকার নতুন-পুরনো কোন সন্ত্রাসী গোষ্ঠি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারলেও, এবার হাজারও গ্যাং ত্রাস সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। যারা এতদিন বখতিয়ারের দাপটের কাছে মাথানত করে ছিল, তারা সুযোগ বুঝে চাঙ্গা হলে কুতুপালং হয়ে উঠবে সন্ত্রাসীর অভয়ারণ্য। এরই মধ্যে হত্যাকান্ড শুরু হয়েছে।  উখিয়ার মধুরছড়া ক্যাম্পের  রহিম উল্লাহ নামের এক যুবককে সন্ত্রাসীরা পিটিয়ে হত্যা করেছে। বুধবার দিবাগত গভীর রাতে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন ক্যাম্পের মাঝি সিরাজুল মোস্তফা।

রোহিঙ্গারা বলছেন, বখতিয়ার মৌলভী মাদকের সাথে কতটা জড়িত তা প্রশাসন ভাল জানবে। তবে তিনি রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করায় অনেক অপরাধী, দুষ্কৃতকারী, মাদক চোরাকারবারী, চাঁদাবাজ, ধর্ষক, নারীলোভী ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলে ক্যাম্পের কি অবস্থা তা ভাবলেই ভয় লাগে।

স্থানীয়রা বলছেন, বখতিয়ার গরিব মানুষকে নীপিড়ন করতেননা। তবে যাকে তিনি টার্গেট করতেন তিনি শেষ হয়ে যেতো। তাই অপরাপর সন্ত্রাসীরা বখতিয়ারের সামনে দাঁড়ানোর সাহস করেনি। কিন্তু এখন সন্ত্রাসীরা আস্তে আস্তে বের হচ্ছে।

বখতিয়ার সম্পর্কে যা বলছে প্রশাসন

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, বখতিয়ার আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর কাছে বলেছেন, তিনি কাউকে ভয় পান না। টাকা দিয়ে সবাইকে কিনতেন। প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা, সাংবাদিকসহ অনেককে ১ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসিক মাসোয়ারা দিত সে। কাকে কত টাকা দিত সেসব তথ্য আইনশৃংঙ্খলা বাহিনীর কাছে দিয়ে গেছে বখতিয়ার।

র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারের উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, সন্ত্রাসবাদ ও মাদকের সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, যতই ক্ষমতাশালী হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। সেভাবে এগুচ্ছে আইনশৃংঙ্খলা বাহিনী।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা রাজা বখতিয়ার ও সাইফুল করিম যখন রেহাই পায়নি, বাকিরাও পার পাবে না।

Comments are closed.